রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬
সিলেটের খবর

সিলেটে প্রবাসী আয় বাড়লেও বিনিয়োগে অনাগ্রহ, বাড়ছে ভোগব্যয়

ডেস্ক রিপোর্ট • ২১ অক্টোবর ২০২৬, ০২:৪৯ রাত • পঠিত: ১৪ বার
সিলেটে প্রবাসী আয় বাড়লেও বিনিয়োগে অনাগ্রহ, বাড়ছে ভোগব্যয়

সিলেটের অর্থনীতি ও জীবনযাত্রায় প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সের প্রভাব স্পষ্ট। এই অর্থে শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত গড়ে উঠেছে বিলাসবহুল বাড়ি, বহুতল ভবন ও সুসজ্জিত ফ্ল্যাট। বেড়েছে দামি গাড়ির ব্যবহারও। তবে বিপুল পরিমাণ রেমিট্যান্সের তুলনায় উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ কম হওয়ায় প্রত্যাশিত শিল্পায়ন ঘটছে না এ অঞ্চলে।


প্রবাসীদের মতে, বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশের অভাব, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, পুঁজির নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ এবং সম্পদের মালিকানা নিয়ে বিরোধের কারণে দেশে বিনিয়োগে আগ্রহ কমছে। একই সঙ্গে প্রবাসে বেড়ে ওঠা নতুন প্রজন্মের বাংলাদেশমুখী আগ্রহ কমে যাওয়ায় দেশের সম্পদ বিক্রি করে অর্থ বিদেশে নিয়ে যাওয়ার প্রবণতাও তৈরি হয়েছে।


রেমিট্যান্সে সমৃদ্ধি, শিল্পায়নে পিছিয়ে


একসময় সিলেটের বিভিন্ন আবাসন প্রকল্প, বহুতল বাণিজ্যিক ভবন, মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে প্রবাসীদের উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ ছিল। বিশেষ করে যুক্তরাজ্যপ্রবাসী সিলেটিরা বিভিন্ন প্রকল্পে বড় অঙ্কের পুঁজি বিনিয়োগ করতেন। প্রায় তিন দশক আগেও অঞ্চলের বহু প্রকল্পে প্রবাসীরাই ছিলেন গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগকারী।


কিন্তু সময়ের সঙ্গে পরিস্থিতি বদলেছে। প্রত্যাশিত মুনাফা না পাওয়া, বিনিয়োগের নিরাপত্তা নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং মালিকানা সংক্রান্ত বিরোধসহ নানা কারণে অনেক প্রবাসী নতুন বিনিয়োগ থেকে সরে এসেছেন।


এর একটি উদাহরণ হিসেবে সিলেটের কোম্পানীগঞ্জে গড়ে ওঠা হাইটেক পার্কের কথা উল্লেখ করা যায়। প্রকল্পটি ঘিরে শুরুতে প্রবাসীদের কাছ থেকে বড় অঙ্কের বিনিয়োগের প্রত্যাশা থাকলেও সেই অনুযায়ী সাড়া পাওয়া যায়নি।


অব্যবহৃত বাড়ি ও জমিতে আটকে পুঁজি


সিলেটের প্রবাসীদের কাছে দীর্ঘদিন ধরে দৃষ্টিনন্দন বাড়ি আভিজাত্য ও সামাজিক মর্যাদার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। ফলে অনেকে দেশে নিয়মিত বসবাস না করলেও শহর কিংবা গ্রামে কোটি টাকা ব্যয়ে বাড়ি নির্মাণ করেছেন। এসব বাড়ির অনেকগুলো বছরের বড় সময়জুড়ে খালি বা তালাবদ্ধ থাকে। কোথাও কোথাও আত্মীয়স্বজন কিংবা গৃহকর্মীরা এসব বাড়িতে বসবাস করেন।


বাড়ি নির্মাণের পাশাপাশি জমি কেনার প্রতিও প্রবাসীদের আগ্রহ ছিল ব্যাপক। বিশেষ করে নিজ এলাকায় কৃষিজমি কেনাকে অনেকে সামাজিক অবস্থান ও প্রভাব-প্রতিপত্তির অংশ হিসেবে দেখতেন। কিন্তু পরবর্তী সময়ে এসব সম্পদের মালিকানা ও ভোগদখল নিয়ে পারিবারিক বিরোধ তৈরি হয়েছে। এতে সম্পদ কেনার পাশাপাশি বাড়ি ও জমিতে নতুন করে অর্থ বিনিয়োগের আগ্রহও কমেছে বলে সংশ্লিষ্টদের অভিমত।


অর্থনীতির দৃষ্টিতে, অব্যবহৃত বাড়ি ও জমিতে বিপুল পুঁজি আটকে থাকলে তা সরাসরি নতুন শিল্প, কর্মসংস্থান কিংবা উৎপাদনশীল ব্যবসা গড়ে তোলার কাজে ব্যবহারের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ে।


সিলেটে এসেছে ২.৯২ বিলিয়ন ডলার


বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশে মোট রেমিট্যান্স এসেছে ৩৫ দশমিক ৫৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এর মধ্যে সিলেট বিভাগ পেয়েছে ২ দশমিক ৯২ বিলিয়ন ডলার। রেমিট্যান্সপ্রাপ্তির দিক থেকে দেশের শীর্ষ বিভাগগুলোর মধ্যে রয়েছে সিলেট।


অন্য একটি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সিলেট বিভাগে রেমিট্যান্স এসেছে ১ দশমিক ৬২৪ বিলিয়ন ডলার। তবে এই অর্থের কত অংশ শিল্পকারখানা, উৎপাদনশীল ব্যবসা কিংবা কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী খাতে বিনিয়োগ হয়েছে, তার নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান নেই।


স্থানীয় গবেষকদের ধারণা, সিলেটে প্রবাসীদের পাঠানো অর্থের প্রায় ৯০ শতাংশ বাড়িঘর নির্মাণ ও দেশে থাকা স্বজনদের ভোগবিলাসে ব্যয় হয়। তবে এই হিসাবের পক্ষে নির্দিষ্ট গবেষণা বা পদ্ধতিগত তথ্য উল্লেখ করা হয়নি।


বিনিয়োগে বাধা সরকারি অসহযোগিতা ও জটিলতা


ইউকে এনআরবি সোসাইটির পরিচালক এম আহমেদ জুনেদ মনে করেন, দেশে প্রবাসীদের বিনিয়োগ কম হওয়ার পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। তাঁর মতে, সরকারি অসহযোগিতা, রাজনৈতিক প্রভাব, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশের অভাব এবং বিনিয়োগ করা অর্থ ফেরত নেওয়ার জটিলতা প্রবাসীদের নিরুৎসাহিত করছে।


তিনি আরও বলেন, যুক্তরাজ্যে বেড়ে ওঠা বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত তৃতীয় প্রজন্মের মধ্যে বাংলাদেশের প্রতি আগ্রহ কমছে। তাদের দেশে ফিরিয়ে আনা কিংবা বিনিয়োগে উৎসাহিত করার মতো পরিবেশও যথেষ্ট তৈরি হয়নি। ফলে ভবিষ্যতের কথা বিবেচনা করে কিছু প্রবাসী দেশে নতুন বিনিয়োগের পরিবর্তে বিদ্যমান সম্পদ বিক্রি করে অর্থ বিদেশে নিয়ে যাওয়ার পথ বেছে নিচ্ছেন।


প্রবাসী বিনিয়োগ বাড়াতে উদ্যোগের আশ্বাস


প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী অবশ্য দেশে বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ রয়েছে বলে দাবি করেছেন। তাঁর বক্তব্য, অতীতের যেকোনো সরকারের তুলনায় বর্তমান সরকার প্রবাসীদের বিষয়ে বেশি আন্তরিক।


মন্ত্রী জানান, প্রবাসীরা দেশে বিনিয়োগ করতে চাইলে সরকার তাঁদের সহযোগিতায় সর্বাত্মক চেষ্টা করবে।


তবে সিলেটে রেমিট্যান্সের অর্থকে উৎপাদনশীল বিনিয়োগে রূপ দিতে হলে শুধু আগ্রহ প্রকাশই যথেষ্ট নয়। বিনিয়োগের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, মালিকানা বিরোধ নিষ্পত্তি, প্রশাসনিক জটিলতা কমানো এবং নতুন প্রজন্মের প্রবাসীদের আস্থা অর্জন গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এসব ক্ষেত্রে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া গেলে প্রবাসী অর্থ থেকে শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির সুযোগ বাড়তে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন:
Facebook Twitter WhatsApp