রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬
লাইফস্টাইল

জিনের আছর নাকি মানসিক রোগ: ভয় বা লজ্জা নয়, প্রয়োজন সচেতনতা ও সহমর্মিতা

ডা. সাঈদ এনাম • ২২ অক্টোবর ২০২৬, ০২:৪৭ রাত • পঠিত: ৮০ বার
জিনের আছর নাকি মানসিক রোগ: ভয় বা লজ্জা নয়, প্রয়োজন সচেতনতা ও সহমর্মিতা

একটি পরিবারের সদস্য হঠাৎ অস্থির হয়ে উঠলেন। রাতে ঘুম নেই, কথা কমে গেছে, কখনো অকারণে ভয় পাচ্ছেন, কখনো আচরণ করছেন অস্বাভাবিকভাবে। পরিবারের কেউ বললেন, “জিনে ধরেছে।” কেউ বললেন, “বাতাস লেগেছে।”

শুরু হলো কবিরাজের সন্ধান। আনা হলো তাবিজ, পানি পড়া আর ঝাড়ফুঁকের ব্যবস্থা। কিন্তু তাতে রোগীর কষ্ট কমল না। বরং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পেতে দেরি হওয়ায় তাঁর অবস্থা আরও জটিল হয়ে উঠল। অথচ সময়মতো মনোরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিলে অনেক কষ্ট লাঘব হতে পারত, দ্রুত শুরু হতে পারত উপযুক্ত চিকিৎসা।

এটি একটি কাল্পনিক দৃশ্য হলেও এমন অভিজ্ঞতা বহু পরিবারের বাস্তবতার সঙ্গে মিলে যায়।

কেন মানসিক রোগকে জিন-ভূতের আছর বলে আড়াল করা হয়?

চিকিৎসাবিজ্ঞানে এত অগ্রগতি, শিক্ষার এত প্রসার তবু কেন কিছু মানুষ মানসিক রোগকে জিন-ভূতের আছর বলে বিশ্বাস করেন বা প্রচার করেন?

এর পেছনে রয়েছে কুসংস্কার, বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা, সামাজিক ভয় এবং সর্বোপরি লোকলজ্জা। আমাদের সমাজে মানসিক রোগ সম্পর্কে এখনো অনেক নেতিবাচক ধারণা প্রচলিত। ফলে পরিবারের কেউ মানসিক রোগে আক্রান্ত হলে অনেকেই বিষয়টি প্রকাশ করতে সংকোচ বোধ করেন।

লোকলজ্জার আড়ালে হারিয়ে যায় চিকিৎসার সুযোগ

কিছু পরিবার মানসিক রোগের বিষয়টি জেনেশুনেই গোপন রাখতে চান। রোগীর নিয়মিত ওষুধ সেবনের কথা আড়াল করে তাঁরা বলেন, তিনি কবিরাজের চিকিৎসা নিচ্ছেন কিংবা ঝাড়ফুঁকে সুস্থ হয়ে উঠছেন। এর পেছনে কাজ করতে পারে সামাজিকভাবে হেয় হওয়ার ভয় এবং মানসিক রোগ সম্পর্কে প্রচলিত নেতিবাচক ধারণা।

দুঃখজনক হলো, কখনো কখনো শিক্ষিত মানুষও এই ভয় ও লজ্জার কাছে হার মানেন। পরিবারের সদস্যের মানসিক রোগ স্বীকার না করে তাঁরা অলৌকিক ব্যাখ্যার আশ্রয় নেন।

কিন্তু সত্যকে আড়াল করলে রোগ সেরে যায় না। বরং চিকিৎসা শুরু করতে দেরি হতে পারে, বাড়তে পারে রোগীর দুর্ভোগ।

মানসিক রোগ আসলে কী?

মানসিক রোগের বিকাশে মস্তিষ্কের গঠন ও কার্যকারিতা, নিউরোট্রান্সমিটারের ভূমিকা, জিনগত বৈশিষ্ট্য, জীবনের অভিজ্ঞতা এবং সামাজিক পরিবেশসহ বিভিন্ন বিষয় জড়িত থাকতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট ক্ষত বা স্নায়বিক রোগের কারণেও মানসিক উপসর্গ দেখা দিতে পারে।

তবে সব মানসিক রোগের পেছনে মস্তিষ্কের দৃশ্যমান ক্ষত থাকে না। অনেক মানসিক রোগ নির্ণয় করা হয় রোগীর উপসর্গ, আচরণ, ব্যক্তিগত ও পারিবারিক ইতিহাস এবং চিকিৎসকের ক্লিনিক্যাল মূল্যায়নের ভিত্তিতে।

অর্থাৎ, মানসিক রোগের কারণ ও প্রকাশ একেকজনের ক্ষেত্রে একেক রকম হতে পারে। তাই রোগীকে ভয় দেখানো বা অনুমানের ভিত্তিতে অলৌকিক কোনো কারণ চাপিয়ে দেওয়ার পরিবর্তে প্রয়োজন সঠিক মূল্যায়ন।

চিকিৎসা আছে, সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনাও আছে

বিষণ্নতা (Depression), উদ্বেগজনিত রোগ (Anxiety Disorders), সিজোফ্রেনিয়া (Schizophrenia), বাইপোলার ডিসঅর্ডার (Bipolar Disorder) সহ অনেক মানসিক রোগের কার্যকর চিকিৎসা রয়েছে।

রোগের ধরন ও তীব্রতা অনুযায়ী ওষুধ, সাইকোথেরাপি, পারিবারিক সহযোগিতা এবং পুনর্বাসনের মাধ্যমে অনেকেই উল্লেখযোগ্যভাবে সুস্থ হয়ে ওঠেন এবং স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বহুল উদ্ধৃত হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বে প্রতি আটজন মানুষের মধ্যে প্রায় একজন কোনো না কোনো মানসিক ব্যাধিতে আক্রান্ত হন। অর্থাৎ, মানসিক রোগ কোনো বিরল ঘটনা নয় এটি জনস্বাস্থ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

তাহলে চিকিৎসার বদলে রোগীকে ভয় দেখানো হবে কেন? তাঁর কষ্টকে জিন ভূতের আছর বলে ব্যাখ্যা করে নির্যাতনের দিকে ঠেলে দেওয়া হবে কেন?

ধর্মীয় বিশ্বাস ও চিকিৎসা দুটিকে মুখোমুখি দাঁড় করানোর প্রয়োজন নেই

কেউ ব্যক্তিগত বিশ্বাস থেকে প্রার্থনা বা আধ্যাত্মিক চর্চা করতে পারেন। এতে আপত্তির কিছু নেই, যদি তা রোগীর ক্ষতি না করে এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসার বিকল্প হয়ে না দাঁড়ায়।

কিন্তু ভয় দেখানো, মারধর করা, বেঁধে রাখা, তাবীজ গরম করে কপালে লাগানো, আঙুল বেঁধে রাখা, অনাহারে রাখা কিংবা চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ বন্ধ করে দেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এসব আচরণ রোগীর শারীরিক ও মানসিক ক্ষতি বাড়াতে পারে।

অলৌকিক নিরাময়ের প্রতিশ্রুতি দিলে সতর্ক হোন

কেউ যদি অলৌকিকভাবে সম্পূর্ণ সুস্থ করে দেওয়ার নিশ্চয়তা দিয়ে রোগীকে চিকিৎসা থেকে দূরে সরিয়ে দেন, তবে সতর্ক হওয়া জরুরি। মানুষের অসহায়ত্বকে পুঁজি করে অর্থ উপার্জন এবং চিকিৎসা বন্ধ করতে উৎসাহিত করা রোগীর জন্য বিপজ্জনক হতে পারে।

বিশ্বাসের স্বাধীনতা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি রোগীর নিরাপত্তা, মর্যাদা ও চিকিৎসা পাওয়ার অধিকারও গুরুত্বপূর্ণ।

আমাদের করণীয় কী?

মানসিক রোগের লক্ষণ দেখা দিলে দেরি না করে মনোরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন। প্রয়োজন অনুযায়ী ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্টের সহায়তাও গ্রহণ করুন। রোগীর কথা মন দিয়ে শুনুন, তাঁকে ভালোবাসা ও সহযোগিতা দিন। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ বন্ধ করবেন না। রোগীর আচরণকে কেন্দ্র করে অপমান, উপহাস বা সামাজিক বিচ্ছিন্নতা তৈরি করবেন না।

আসুন, মানসিক রোগ নিয়ে লজ্জা নয়, সচেতনতা ছড়াই। কুসংস্কারের বদলে জ্ঞানকে গুরুত্ব দিই। ভয় দেখিয়ে নয়, ভালোবাসা ও সহমর্মিতা দিয়ে রোগীর পাশে দাঁড়াই।

কারণ, একজন মানসিক রোগীর পাশে দাঁড়ানো মানে শুধু একজন মানুষকে সাহায্য করা নয় একটি পরিবারকে আশার আলো দেখানো। মনে রাখুন, মানসিক রোগের চিকিৎসা করানো দুর্বলতা নয় এটি সুস্থতার পথে এগিয়ে যাওয়ার সাহসী পদক্ষেপ।


ডা. সাঈদ এনাম
সহযোগী অধ্যাপক, ডিপার্টমেন্ট অব সাইকিয়াট্রি।
ইন্টারন্যাশনাল ফেলো, আমেরিকান সাইকিয়াট্রিক এসোসিয়েশন।

সংবাদটি শেয়ার করুন:
Facebook Twitter WhatsApp

সম্পর্কিত খবর