সম্প্রতি ঢাকার জেলা প্রশাসক ফরিদা খানমের একটি ব্যতিক্রমী উদ্যোগ আমার ভালো লেগেছে। একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তা হিসেবে দূর থেকে শুধু প্রতিবেদন দেখার পরিবর্তে তিনি নিজেই সাধারণ সেবা গ্রহীতার বেশে মাঠপর্যায়ে গিয়ে সরকারি সেবার বাস্তব চিত্র দেখার উদ্যোগ নিয়েছেন। জানা যায়,ভদ্র মহিলা গত ২৯শে সেপ্টেম্বর কালো বোরকা পরে অত্যন্ত সাধারণ এক নারীর বেশে তিনি ঢাকার উত্তর খান ইউনিয়ন ভূমি অফিসে আকস্মিক পরিদর্শনে যান। সেখানে উপস্থিত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কেউই প্রথমে বুঝতে পারেননি যে, তাদের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা সাধারণ একজন সেবাগ্রহীতা আসলে ঢাকা জেলার জেলা প্রশাসক।তিনি অন্য সেবাগ্রহীতাদের মতো লাইনে দাাড়িয়ে কর্মরত স্টাফদের কাছ থেকে জমির নামজারি (মিউটেশন) প্রক্রিয়া, সরকারি ফি ও সেবা পাওয়ার পদ্ধতি সম্পর্কে খোঁজখবর নেন। পাশাপাশি সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলে তাঁদের সুবিধা অসুবিধা জানার চেষ্টা করেন। সেবাগ্রহিতাদের নিকট থেকে জানতে চান ভূমিসেবা নিতে এসে কোনো ধরনের বিলম্বনা, ভোগান্তি, অনিয়ম কিংবা হয়রানির শিকার হচ্ছেন কি না।
এই অভিযানে জেলা প্রশাসক সরজমিনে যেমন বুঝতে পেরেছেন সেবা গ্রহিতাদের সমস্যা তেমনি অনন্যা অফিসের কর্মরত কর্মচারিরা কিছুটা হলে ও কাজের সময় দূর্নীতি করতে সাহস পাবে না। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, তিনি শুধু মানুষের মুখে অভিযোগ শোনেননি; বরং নিজেই একজন সাধারণ নাগরিকের অবস্থানে থেকে সেবা গ্রহণের প্রক্রিয়াটি দেখেছেন। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আচরণ, সেবাগ্রহীতাদের সঙ্গে তাদের ব্যবহার এবং সাধারণ মানুষের জন্য ভূমিসেবা কতটা সহজ সরাসরি পর্যবেক্ষণ করেছেন। দায়িত্ব শুধু অফিসের চার দেয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকার কথা নয়। কিন্তু আমাদের দেশে এটাই নিয়ম হয়ে দাড়িয়েছে ।
নিউজটি দেখ আমার মনে হল দেশের প্রতিটি জেলা প্রশাসক যদি ফরিদা খানমের মতো করে মাঝে মাঝে সাধারণ মানুষের কাতারে দাঁড়িয়ে সরকারি সেবার বাস্তব চিত্র দেখতেন, তাহলে হয়তো দেশে অনেকটা অনিয়ম ও দুর্নীতি কমে আসতো। বাংলাদেশে এখন সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্থ বিভাগ হচ্ছে ভূমি অফিস।
এই বিভাগের অনিয়ম নিয়ে সাধারণ মানুষের বিস্তর অভিযোগ রয়েছে ।নামজারি,খতিয়ান, জমির রেকর্ড সহ বিভিন্ন ভূমিসেবা নিতে গিয়ে হয়রানি, দীর্ঘসূত্রতা কিংবা অনৈতিক অর্থ দাবির অভিযোগ প্রায়ই শোনা যায়। মানুষের মুখে এমন কথাও শোনা যায়—টাকা না দিলে নাকি এই অফিসের কোন ফাইল নড়ে না। এসব অভিযোগের সবগুলো হয়তো সত্য নয়। কিন্তু এত মানুষের কাছ থেকে একই ধরনের অভিযোগ আসা নিঃসন্দেহে প্রশাসনের জন্য গুরুত্বের সঙ্গে দেখার বিষয়।আমি নিজে দেশের বাহিরে থাকি।কিছুদিন আগে জানতে পারলাম আমাদের দাদার আমল থেকে দখলে থাকা বাড়ীর পুকুরের জমি ও নাকি অন্য একজনের নামে রেকর্ড হয়ে গেছে। বলার অপেক্ষা রাখে না বিষয়টি কতটা উদ্বেগজনক। রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকার কারণে বিভিন্ন সময়ে মানুষ ভূমি-সংক্রান্ত নানা অভিযোগ নিয়ে আমার কাছে অভিযোগ করেন । অনেক সময় বাধ্য হয়ে সংশ্লিষ্টদের ফোন করে বিষয়টি দেখার অনুরোধ করি। কিন্তু শুধু ব্যক্তিগত ফোন বা পরিচয়ের মাধ্যমে সমস্যার সমাধান হওয়া কোনো টেকসই ব্যবস্থা হতে পারে না।
প্রত্যেক নাগরিকের সুবিধা পাওয়া তাঁর নাগরিক অধিকার এবং এটা সংবিধান ধারা স্বীকৃত।ন্যায্য অধিকার পেতে কারও ব্যক্তিগত সুপারিশ, পরিচয় বা ফোনের ওপর নির্ভর করতে বাধ্য না হন—এটাই হওয়া উচিত একটি কার্যকর রাষ্ট্রব্যবস্থার লক্ষ্য।আমার পরিচিত একজন ব্যক্তি দীর্ঘদিন ভূমি অফিসে চাকরি করেছেন। তিনি প্রায় এক বছর আগে মারা গেছেন। জীবদ্দশায় তিনি কী পরিমাণ সম্পদ অর্জন করেছিলেন, তার বৈধতা কী ছিল—এসব বিষয়ে আমি নিশ্চিতভাবে কিছু বলতে পারি না। তবে এমন ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা এবং মানুষের কাছ থেকে প্রতিনিয়ত আসা অভিযোগ আমাকে একটি প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়—সরকারি দপ্তরে কর্মরত একজন ব্যক্তির সম্পদের সঙ্গে তার বৈধ আয়ের সামঞ্জস্য আছে কি না, সেটি যাচাই করার কার্যকর ব্যবস্থা কি দেশে শক্তিশালী করা যায় না?
আজ সমাজে অনেক ক্ষেত্রেই এমন একটি সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে বলে মনে হয়, যেখানে মানুষ ন্যায্য সেবা পাওয়ার আগেই ভাবতে শুরু করেন—“কাকে ধরব, কাকে ফোন করব, কত দিতে হবে?” এই মানসিকতা একটি রাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর।তাই ফরিদা খানমের মতো সরেজমিনে, পরিচয় গোপন রেখে এবং সাধারণ নাগরিকের অবস্থানে দাঁড়িয়ে সরকারি সেবা পর্যবেক্ষণের উদ্যোগ আরও বিস্তৃত হওয়া দরকার। শুধু ভূমি অফিস নয়—যেসব সরকারি দপ্তরে সাধারণ মানুষ প্রতিদিন সেবা নিতে যান, সেসব প্রতিষ্ঠানেও নিয়মিত আকস্মিক পরিদর্শন, অভিযোগ যাচাই, সেবার নির্ধারিত সময় ও ফি কঠোরভাবে বাস্তবায়ন এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।
সবচেয়ে বড় কথা, দুর্নীতি দমনের দায়িত্ব শুধু একজন জেলা প্রশাসক বা কয়েকজন কর্মকর্তার নয়।একটি স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও নাগরিকবান্ধব প্রশাসনিক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হলে পুরো ব্যবস্থাকেই কার্যকর করতে হবে।মানুষ যেন নিজের জমির কাগজপত্র ঠিক করতে গিয়ে কারও দয়া, সুপারিশ কিংবা ঘুষের ওপর নির্ভরশীল না হয়—এটাই হোক আমাদের প্রত্যাশা।সরকারি অফিসে নাগরিকের পরিচয় নয়, তার অধিকারই যেন তার সেবা পাওয়ার প্রধান পরিচয় হয় সরকারর পক্ষ থেকে এমন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরী ।
কেবল প্রশাসনের চেয়ারে বসে জনগণের সমস্যা দেখার চেয়ে, জনগণের কাতারে দাঁড়িয়ে সমস্যার বাস্তব চিত্র দেখা ও কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া ভিন্ন কথা। এখন দেশে এই কাজটিরই প্রয়োজন বেশী। ফরিদা খানমের এই উদ্যোগের মতো জনবান্ধব ও সরেজমিনভিত্তিক তৎপরতা সরকারি সেবাকে আরও সহজ, স্বচ্ছ ও মানুষের আস্থার কাছাকাছি নিয়ে আসুক—এই প্রত্যাশা।
লেখক - যুক্তরাষ্ট প্রবাসী কলামিষ্ট ও সমাজকরমী, নিউইয়র্ক।